বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

টেলিভিশন টকশোর পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু: এরকম বিতর্ক অনুষ্ঠান কি নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ

অমিতাভ ভট্টশালী
বিবিসি, কলকাতা

টেলিভিশনে সন্ধ্যেবেলায় যে বিতর্ক অনুষ্ঠানগুলো হয়, তার ওপরে কোনওরকম নিয়ন্ত্রণ রাখা উচিত কী না, তা নিয়ে ভারতে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

কংগ্রেস দলের জাতীয় মুখপাত্র রাজীব ত্যাগী বুধবার একটি ‘হাই-ভোল্টেজ’ টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নেওয়ার পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ব্যাঙ্গালোরে কদিন আগে যে সহিংসতা হয়ে গেছে, সেই বিষয়ের ওপরেই আজ-তক চ্যানেলে ওই বিতর্ক হচ্ছিল।

বিজেপির মুখপাত্র এবং জাতীয় টেলিভিশনে অতি পরিচিত মুখ সম্বিৎ পাত্রের সঙ্গে মি. ত্যাগীর উচ্চস্বরে তর্ক হয়েছিল। আজ-তক চ্যানেলে ওই বিতর্কের দুটি অংশ সামাজিক মাধ্যমে বহু মানুষ শেয়ার করেছেন।

সেখানে দেখা গেছে সম্বিৎ পাত্র মি. ত্যাগীকে কিছুটা ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন এই বলে যে কপালে টিকা লাগালেই কেউ সাচ্চা হিন্দু হয়ে যায় না। মি. ত্যাগীর কপালে সেদিন একটা টিকা ছিল।

বিতর্কটির আরেকটি অংশ যা সামাজিক মাধ্যমে অনেকে শেয়ার করছেন, সেখানে দৃশ্যতই অসুস্থ লাগছিল রাজীব ত্যাগীকে।

তার মৃত্যুর পরে সম্বিৎ পাত্র এবং টি ভি চ্যানেলটিকে দায়ী করে অনেকেই পোস্ট করেছেন। তবে কংগ্রেস নেতার মৃত্যুসংবাদ শুনে মি. পাত্র টুইট করেছেন, “বিশ্বাস করতে পারছি না যে কংগ্রেস মুখপাত্র, আমার বন্ধু রাজীব ত্যাগী আর আমাদের মধ্যে নেই। আজ বিকেল ৫টার সময়েও আমরা আজ-তক চ্যানেলে একটা বিতর্কে একসঙ্গে ছিলাম। জীবন এতটাই অনিশ্চিত।”

বেশিরভাগ সংবাদ চ্যানেলেই সন্ধ্যেবেলার প্রাইম টাইমে বিতর্কসভা বা টকশোয়ের আয়োজন থাকে আর সেসব বিতর্কে মূলত রাজনীতির বিষয় নিয়েই চর্চা হয়।

কলকাতার টি ভি চ্যানেলগুলিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসাবে পরিচিত মুখ অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলছিলেন, “রাজনীতিই বেশিরভাগ দিন বিতর্কের বিষয় থাকে, কারণ হাতে গরম রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে তর্ক বিতর্ক দেখতে চায় মানুষ। তাই চ্যানেলগুলোও সেভাবেই তাদের বিতর্কের বিষয় সাজায়।”
টকশোতে অংশ নেয়ার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হন রাজীব ত্যাগী

তার কথায়, “কোনও কোনও চ্যানেলে একই বিষয়ের ওপরে কথা বলার জন্য ১০-১২ জন পর্যন্তও অতিথিকে নিয়ে আসে। খুব তাড়াতাড়িই সবাই তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন – একসঙ্গে প্রত্যেকেই কথা বলতে চেষ্টা করেন এবং নিজের মতামতটা চাপিয়ে দিয়ে জেতার চেষ্টা করতে থাকেন। ফলত চিৎকার ছাড়াকিছুই শোনা যায় না।”

এধরনের বিতর্কের সময়ে টি ভি চ্যানেলগুলির রেটিং যথেষ্ট ওপরের দিকে থাকে, যা থেকে অধ্যাপক নন্দর বিশ্লেষন, “সাধারণ মানুষও বোধহয় এরকমটাই দেখতে চায়। সেজন্য যে চ্যানেলে যত বেশি তর্কবিতর্ক-চেঁচামেচি, তার টি আর পি ততই বেশি।”

নিয়মিত দর্শকদের কেউ কেউ বলেন রাজনীতির চর্চা মোটেই হয় না, শুধুই চিৎকার চেঁচামেচি হয়। উত্তেজিত হয়ে অতিথিরা হাতাহাতি করেছেন, এমন ঘটনাও হয়েছে কলকাতার একটি টি ভি বিতর্কে।

নিউজ টাইম চ্যানেলটির সিনিয়ার সংবাদ উপস্থাপক ও টি ভি টক শোয়ের সঞ্চালক পার্থ ব্যানার্জী সেই ঘটনার সাক্ষী।

তিনি বলছিলেন, “সমস্যাটা হয় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হয়ে যারা আসেন, মূলত তাদের নিয়ে। এখন তো টি ভিতে মুখ দেখাতে পারলেই নেতা হওয়া যায় সহজে। তাই দল যখন একজনকে পাঠাচ্ছে টি ভি বিতর্কে, নেতাদের সবসময়ে চেষ্টা থাকে বিপক্ষের চিৎকারের ওপরে আমাকে গলা চড়িয়ে কথা বলতে হবে। যদি জিততে না পারি তাহলে দল হয়তো আমাকে এরপর আর টি ভি টকশোয়ে পাঠাবে না। যেন চিৎকার করাটাই নিজের দল বা নিজের মতামতকে সেরা বলে প্রমাণ করার একটা মাত্র উপায়।

“সমস্যাটা বেশি হয় আমার বা আমার মতো সঞ্চালকদের। মাঝখানে বসে সামলাতে হয় দুই যুযুধান পক্ষকে। অনেক সময়ে হয়েছে কিছুতেই যখন অতিথিদের থামানো যাচ্ছে না, তখন বাধ্য হয়ে বিজ্ঞাপন বিরতি নিয়ে নিয়েছি। বিরতির সময়ে কিন্তু আর কোনও তর্ক নেই। যেহেতু মানুষের সামনে চিৎকার করে নিজের দলের মত প্রতিষ্ঠা করার দরকার নেই, তাই তখন আর চেঁচামেচি করে কেউ শক্তি ক্ষয় করতে চান না। এতেই বোঝা যায় যে অতিথিরা আসলে উত্তেজিত হয়ে যে চেঁচামেচিটা করেন, তার সবটাই অভিনয়,” বলছিলেন পার্থ ব্যানার্জী।

ওই ঘটনার পরে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চলছে যে ভারতের টি ভি বিতর্ক অনুষ্ঠানগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন কী না, তা নিয়ে।

কংগ্রেস দলের আরেক মুখপাত্র জয়বীর শেরগিল কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী প্রকাশ জাভরেকরকে একটি চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছেন “উত্তেজনাপূর্ণ, কুৎসাপূর্ণ, বিষাক্ত টি ভি বিতর্কগুলি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি আচরন বিধি” তৈরি করতে।

টি ভি চ্যানেলের বিতর্কগুলির ক্রমশই ব্যক্তিগত আক্রমনের পর্যায়ে চলে যায়, সেটা অনেক প্রবীন সাংবাদিক, যারা নিয়মিত এধরণের বিতর্কগুলি যান, তাদের অনেকেই মনে করেন।
টেলিভিশন টকশোর মান নীচে নেমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন অনেকে
কেউ কেউ তো এইসব বিতর্কগুলিকে ‘মুরগির লড়াই’ও বলে থাকেন। অনেকে আবার বিরক্ত হয়ে টিভি বিতর্কগুলিতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এরকমই একজন, প্রবীন সংবাদ সঞ্চালক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক উর্মিলেশ।

তিনি বলছিলেন, “বিতর্কগুলোর মান এতটাই নীচে নেমে গেছে, যে আজকাল আর কোনও টি ভি চ্যানেল ডাকলে যাই না। আর কত নামবে এইসব বিতর্কগুলো জানি না। এগুলোর মাধ্যমে এখন খবর প্ল্যান্ট করা হচ্ছে, আবার মানুষের মতামত প্রভাবিত করা হচ্ছে। বেশিরভাগ বেসরকারী চ্যানেলই আজকাল সংবাদ আর তথ্য দেওয়া বাদে বাকি সব কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছে।”

কিন্তু অনেকেই আবার মনে করেন যে আচরন বিধি বা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেই বাক স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলে বিরোধিতা আসবে।

উচ্চস্বরে তর্ক বিতর্ক যে টক শোতে উপস্থিত অতিথিরা করেন, তা নয়।

কয়েকজন সুপরিচিত সঞ্চালক জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলিতে আছেন, যারা অতিথিদের সবাইকে একসঙ্গে কথা বলতে ছেড়ে দেন, আবার কেউ কেউ শুধুই নিজে কথা বলতে থাকেন অতি উচ্চস্বরে – অতিথিদের কথা বলার সুযোগই দেন না তারা। সূত্র:বিবিসি বাংলা।

ভয়েস/জেইউ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION